July 25, 2021

মনিটর কেনার আগে যেসব বিষয় এর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে

আমরা প্রতিদিন যে কাজ করে থাকি নিঃসন্দেহে আমরা তার ফলাফল ভালভাবে দেখার আশায় থাকি।আর যদি ভালভাবে ফলাফল দেখতে ই না পারি তাহলে দিন দিন কাজ করার ইচ্ছা কমতে থাকে। ঠিক তেমন ভাবে আমরা আমাদের কম্পিউটার,ল্যাপটপে যে সমস্ত কাজ গুলো করে থাকি তা যদি আমাদের কম্পিউটার বা ল্যাপটপের মনিটরে আশানুরূপ দেখা না যায় তাহলে কাজ করাই বৃথা।তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কম্পিউটার আমাদের সবার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।শিক্ষাঙ্গন থেকে অফিস যেখানেই যাবেন দেখবেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কম্পিউটার।

যদিও যুগের বিবর্তনে এখন চলছে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট কম্পিউটার।ডেস্কটপ কম্পিউটারের যতগুলো কম্পোনেন্ট রয়েছে তার মধ্যে সবথেকে লক্ষণীয় হল এর মনিটর। আপনি কম্পিউটারে কি কাজ করছেন তার সবকিছুই পরিলক্ষিত হয় এই মনিটরে।মনিটর পছন্দ করার আগে মনিটরের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হবে। আপনার কেমন ডিসপ্লে প্রয়োজন Curved ডিসপ্লে, 2K,4k সমর্থন, গেমিং অপ্টিমাইজেশন, বিল্ট ইন স্পিকার সহ এছাড়া কাজের বৈশিষ্টের উপর ভিত্তি করে মনিটর নির্বাচন করতে হবে।যদি মনিটর নির্বাচনে কোন ভুল হয় সেক্ষেত্রে আপনার কম্পিউটিংয়ে বাজে অভিজ্ঞতা চলে আসবে। সুতরাং মনিটর নির্বাচনে অব্শ্যই কাজের কথা চিন্তা করে সিধান্ত নিতে হবে।

আসুন দেখে নেই মনিটর কেনার আগে যেসব বিষয় এর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে ।

১.কাজের ধরন ও উদ্দেশ্যঃ

মনিটর কেনার ক্ষেত্রে কি ধরনের কাজে ব্যবহৃত হবে, সেই ভিত্তিতে মনিটর পছন্দ করতে হবে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা চান হাই-কনট্রাস্ট ভিএ-প্যানেল, যেখানে তাঁরা দৈনন্দিন কাজে মনিটরটি ব্যবহার করবে যেমনঃ অফিস এর কাজ,সিনেমা দেখা,গান শোনা।

প্রফেশনাল কাজের জন্য এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনার এক্সপার্টদের গুরুত্ব থাকে কালার অ্যাকুরেসিতে।

আর গেমিং পিসির জন্য ভাল রেজুলেশনের সাথে গেমাররা চান ফাস্ট রিফ্রেশ রেট ও কুইক রেসপন্স টাইম।

২. উন্নত মানের ছবি ও রেজুলেশন:

একটি মনিটরের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে মোট যতগুলো পিক্সেল প্রদর্শিত হবে তাকে একত্রে রেজুলেশন বলে। মনিটরের রেজুলেশন বলতে এর ফ্রেমে বিদ্যামান পিক্সেল সংখ্যাকে বোঝায়। 1280×720 ফরম্যাটের মনিটরের অর্থ হচ্ছে এর ফ্রেমের  দৈর্ঘ্যের পিক্সেল সংখ্যা 1280 এবং প্রস্থের পিক্সেল সংখ্যা 720।এই সংখ্যাক পিক্সেল বিশিষ্ট ডিসপ্লে কে এইচডি ডিসপ্লে বলে। আবার 1920 x 1080 ফরম্যাটের মনিটরের অর্থ হচ্ছে এর ফ্রেমের দৈর্ঘ্যের পিক্সেল সংখ্যা 1920 এবং প্রস্থের পিক্সেল সংখ্যা 1080। বাজারে বর্তমানে 4K  এমনকি 8K মনিটরও পাওয়া যায়। 4K ডিসপ্লে’র পিক্সেল সংখ্যা 3840×2160  এবং 8K  এর পিক্সেল সংখ্যা 7680×4320।

৩. রিফ্রেশ রেট:

যে মনিটরের রিফ্রেশ রেট যত বেশি সেটি তত পরিষ্কার ছবি দেয়। হার্জ (Hz) এককে পরিমাপকৃত  গেমিং মনিটরের ক্ষেত্রে এর সংখ্যা কমপক্ষে 75Hz  হওয়া উচিত। তবে, হার্ড কোর গেমারদের ক্ষেত্রে অন্তত 144 Hz রিফ্রেশ রেট থাকা প্রয়োজন। সাধারণ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে রিফ্রেশ রেট 60Hz এর নিচে না হওয়াই ভাল।

৪.প্যানেল টেকনোলজি:

টিএন মনিটর দ্রুততর হলেও নিম্নমানের ছবির জন্য দামে সস্তা। আইপিএস মনিটরের রেসপন্স টাইম ও কালার ভিএ মনিটরের চেয়ে ভাল। আবার ভিএ মনিটর আইপিএস ডিসপ্লে’র চেয়ে অধিকতর ভাল কন্ট্রাস্ট দেয়।

৫.কার্ভ কিংবা ফ্ল্যাট:

পারফরম্যান্সের বিচারে কার্ভ(বাকাঁনো) বা  ফ্ল্যাট(সমতল) মনিটর চান ব্যবহারকারীরা।  ভারী কাজ ও গেমিংয়ের জন্য কার্ভ মনিটর বেশি কার্যকর; সাধারণ কাজের জন্য ফ্ল্যাট মনিটরই যথেষ্ঠ।

৬. রেসপন্স টাইম:

রেসপন্স টাইম রেট যত কম, মনিটরের দ্রুততা তত বেশি। কেবল গেমিং পিসি’র জন্য বিশেষ ধরণের এই মনিটরে প্রতি পিক্সেলে কাল ও সাদা হতে যত কম সময় লাগে তত বেশি তার রেসপন্স টাইম। দ্রুততম মনিটরের রেসপন্স টাইম ১ মিলিসেকেন্ড।

দৈনন্দিন সাধারন কাজের মনিটর

সাধারণ কাজ অর্থাৎ কম্পিউটারের হালকা কাজ, সিনেমা বা ভিডিও দেখা, হালকা গেম খেলা, অফিসিয়াল বা ঘরের কাজের জন্য মনিটরের যেসব বিশেষত্ব বিবেচনা করা যেতে পারে-

  • কন্ট্রাস্ট ও ভিএ প্যানেল: ছবির মান বিচারের ক্ষেত্রে প্রথমে আসে কন্ট্রাস্ট, কালার স্যাচুরেশন, অ্যাকুরেসি এরপর আসে রেজুলেশন। বড় আকারের ডাইনামিক ডিসপ্লে’র ক্ষেত্রে থ্রিডি’র মানের ছবি পাওয়া যায়। ভিএ প্যানেলযুক্ত ডিসপ্লে থেকে আইপিএস বা টিএন-এর তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি কন্ট্রাস্ট পাওয়া যায়।
  • লো ব্লু লাইট: অনেক মনিটরই ব্লু লাইট কমিয়ে রাখার ঘোষণা দেয়। যদিও এটা খুব বেশি পার্থক্য গড়ে না। বরং নীল আলোর ঔজ্জ্বলতা কমিয়ে রাখলে বরং অন্য আলোর ওপর প্রভাব রাখে। গেমিং ও ভিডিও ক্ষেত্রে নীল আলোর প্রাবল্য কিছুটা বিঘ্ন ঘটালেও সাধারণ কাজের ক্ষেত্রে এর কোন সমস্যা নেই।
  • অ্যাসপেক্ট রেশিও: 4:3 অ্যাসপেক্ট রেশিও সাধারণ কাজের জন্য যথেষ্ঠ। তবে হাই-রেজুলেশনের ডিসপ্লে চাইলে 4K মানের 16:9 অ্যাসপেক্ট রেশিও’র মনিটর নিতে পারেন। যদিও দাম কিছুটা বেশি পড়বে।
  • টাচস্ক্রিন: সৌখিন উইন্ডোজ ১০ ব্যবহারকারীরা টাচস্ক্রিন মনিটর ব্যবহার করতে পারেন। যদিও খুব বেশি সুবিধা নেই, তবে ভাল লাগার জন্য অনেকেরই পছন্দ এটি। তবে ডিসপ্লে’র থেকে ব্যবহারকারীর দুরত্ব বেশি হলে এর কোন দরকার নেই।

প্রফেশনাল কাজের জন্য মনিটর

ওয়েব ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ফটোগ্রাফি, স্পেশাল ইফেক্ট আর্টিস্টিক, গেম ডিজাইনার ইত্যাদি কাজের ক্ষেত্রে মনিটর কেনার আগে যেসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে-

  • কালার অ্যাকুরেসি: ভারী কাজের জন্য কালার অ্যাকুরেসি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এক্ষেত্রে মনিটরের ডিফল্ট ক্যালিবারেশন ক্যাপাবিলিটিই যথেষ্ঠ।
  • কালার গ্যামুট, কালার টেম্পারেচার ও গামা কার্ভ: প্রফেশনাল কাজের মনিটর এস-আরজিবি ও অ্যাডোব আরজিবি মানের হতে হবে। সেক্ষেত্রে কালার টেম্পারেচার সীমা 5000 থেকে 7500K হওয়া উচিত। সাধারণ ভিউয়ের ক্ষেত্রে গামা কার্ভ 1.8 থেকে 2.4 এবং ভিডিও বা সিনেমা প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে BT.1886 গামা স্ট্যান্ডার্ড থাকা প্রয়োজন।
  • দীর্ঘ সময় কাজের ক্ষেত্রে ফ্লিকার ফ্রি মনিটর প্রয়োজন: নতুন প্রযুক্তির মনিটর গুলোয় যেকোন ঔজ্জ্বল্যতায় এর ফ্লিকার ফ্রি বা কম্পন মুক্ত ডিসপ্লে থাকে। টানা কাজের ক্ষেত্রে এই মনিটর পছন্দের তালিকায় রাখা উচিত।
  • বিট-ডেপথ: যথাসম্ভব বেশি বিট-প্যানেল যুক্ত মনিটর কেনা উচিত। প্রফেশনাল কাজের ক্ষেত্রে অন্তত 10-bit মনিটর প্রয়োজন, 16-Bit হলেও আরও ভাল।

গেমিং এর জন্য মনিটর

গেমারদের জন্য বিশেষ ধরণের মনিটর তৈরি করা হয়। এর ফিচারে অন্যান্য মানের মনিটর থেকে অনেক বেশি পাথর্ক্য থাকে। গেমিং মনিটর নেবার আগে যেসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে-

  • রেজুলেশন: গেমিং মনিটরের অন্যতম প্রধান শর্ত এর ডিসপ্লে রেজুলেশন। বাজারে হাই-রেজুলেশনের মনিটরের মধ্যে 1080p (Full HD), 1440p (QHD/2K) ও 2160p (UHD/4K) মানের রেজুলেশনের মনিটর পাওয়া যায়। এর মধ্যে হার্ডকোর গেমারদের জন্য কমপক্ষে 1440p (QHD/2K) রেজুলেশনের মনিটর ব্যবহার করা উচিত। এতে 30FPS সুবিধা রয়েছে। এর চেয়ে উন্নত রেজুলেশনের ক্ষেত্রে 2160p (UHD/4K) মনিটর তুলনামূলক ভাল যা থেকে 60FPS পাওয়া সম্ভব।
  • রিফ্রেশ রেট: গেমিং মনিটরের জন্য কমপক্ষে 144Hz রিফ্রেশ রেট থাকা প্রয়োজন। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে রিফ্রেশ রেট এর পাশপাশি এর জিপিইউ পর্যাপ্ত কি না। 144Hz বা 240Hz রিফ্রেশ রেট এর মনিটর নেবার আগে পিসি’র গ্রাফিক্স কার্ড কতটা শক্তিশালী সেটাও বিবেচ্য বিষয়।
  • অ্যাডপ্টিভ সিঙ্ক: ডিসপ্লে’তে নিরবিচ্ছিন্নতা চাইলে ফ্রি সিঙ্ক বা জি-সিঙ্ক ফিচারের মনিটরের কথা মাথায় রাখতে হবে। নতুন গেমিং মনিটরগুলোয় এই দুই ফিচার থাকে। সুতরাং কেনার আগে এটি নিশ্চিত করে নিতে হবে। এএমডি ফ্রি সিঙ্ক বিশিষ্ট মনিটর এর গ্রফিক্স কার্ডের সাথে বিনামূল্যেই এই ফিচার দিয়ে থাকে। তবে এনভিডিয়া জি-সিঙ্কের ক্ষেত্রে বাড়তি ১০০ থেকে ১৫০ ডলার বেশি খরচ পড়ে।
  • প্যানেল টেকনোলজি: আধুনিক মনিটরে তিন ধরণের প্যানেল থাকে- ভিএ,টিএন এবং আইপিএস। আইপিএস প্যানেল তুলনামূলক স্বচ্ছ, অ্যাকুরেট কালার ও ভিউ অ্যাঙ্গেল প্রদান করে থাকে। অন্যদিকে টিএন আইপিএস থেকে ফাস্ট রেসপন্স টাইম দেয় আর ভিএ প্যানেল টিএন থেকে ফাস্ট রেসপন্স টাইম দেয়
  • স্ক্রিন সাইজ: অন্য কাজের ক্ষেত্রে এটি তেমন কোন বিষয় না হলেও গেমিংয়ের ক্ষেত্রে মনিটরের আকার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গেমারদের জন্য ২১ থেকে ২৭ ইঞ্চি সাইজের মনিটর ভাল পারফরম্যান্স প্রদান করে।
  • কানেক্টর: আধুনিক গেমিং মনিটরের ক্ষেত্রে তিন ধরণের ইনপুট ও আউটপুট কানেক্টর থাকে। ১) ডিসপ্লে পোর্ট: অডিও-ভিডিও ট্রান্সফারের জন্য; ২) এইচডিএমআই 1.4/2.0: হাই রেজুলেশনের রিফ্রেশ রেট এর ক্ষেত্রে এইচডিএমআই কাজ করে না, সেক্ষেত্রে ডিসপ্লে পোর্ট কার্যকর; ৩) 3.5 মিমি অডিও জ্যাক হাই পারফরম্যান্স হেডসেট বা স্পিকারের জন্য মেইনবোর্ডের ব্যাক প্যানেলের জ্যাকের বদলে মনিটরের সাথে থাকা অডিও আউটপুট চ্যানেলও ব্যবহার করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *